হজ লিজ চুক্তিতে বিমানে ২০০ কোটি টাকা ক্ষতির আশঙ্কা 

বুধবার ১১ মে ২০২২ ১০:০৬


পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদক ::
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বোর্ড হজ মৌসুমের চাহিদা পূরণের জন্য তাড়াহুড়ো করে জোড়া এ-৩৩০ এয়ারবাসের ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ কারণে বহরের পর্যাপ্ত ক্ষমতা থাকার পরেও জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থাটির প্রায় ২০০ কোটি টাকা ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে।

গত ৩০ এপ্রিল বাংলাদেশ বিমানের ২৭৬তম বোর্ড সভায় লিথুয়ানিয়াভিত্তিক “হেস্টন এয়ারলাইন্সের” সঙ্গে এ বিষয়ক একটি চুক্তির অনুমোদন দেওয়া হয়। বৈঠকে বোর্ডের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ মাত্র আটজন বোর্ড সদস্য এবং বাংলাদেশ বিমানের কর্পোরেট প্ল্যানিং অ্যান্ড ট্রেনিংয়ের আরও তিন কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন।

অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা যায়, আকস্মিক এ সিদ্ধান্তের কারণে সর্বস্তরের অন্যান্য বোর্ড সদস্য ও কর্মচারীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

বাংলাদেশ বিমানের বোর্ডের অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের হজ ফ্লাইটের জন্য কর্পোরেট প্ল্যানিং অ্যান্ড ট্রেনিংয়ের পরিচালক মাহবুব জাহান খান এক জোড়া এয়ারবাস ওয়েট-লিজিংয়ের প্রস্তাবনা জমা দেন। কিন্তু পর্যাপ্ত বিশ্লেষণ এবং গবেষণা না থাকায় সেটি প্রত্যাখ্যান করা হয়। তাছাড়া, ফ্লাইট অপারেশনের পরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্যদের সঙ্গেও কোনো আলোচনা করা হয়নি।

তবে মাহবুব জাহান খান আবারও হেস্টন এয়ারলাইন্সের সঙ্গে চুক্তির প্রস্তাবনা বোর্ডে জমা দেন।

এ বছর হজ ফ্লাইটে বিমান সরবরাহের জন্য ১১টির মতো প্রতিষ্ঠান তাদের আগ্রহের কথা জানিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে অ্যাভিকো এবং এয়ার এশিয়াও। তারা যথাক্রমে ২০১২-২০১৬ এবং ২০১৭ সালে বিমান লিজ নেয়।

এছাড়া, নিজস্ব ব্যবস্থাপনায়ও হজ যাত্রীদের বহন করতে পারত বাংলাদেশ বিমান।

কিন্তু হেস্টন এয়ারলাইন্সের ব্লক-আওয়ার সুবিধা দেওয়ার কারণে বিমানের পরিকল্পনা পরিচালক ছিলেন লিথুয়ানিয়াভিত্তিক সংস্থাটির পক্ষেই। এতে ঘণ্টা প্রতি বাংলাদেশ বিমানের খরচ হবে প্রায় ৭ হাজার ডলার।

চুক্তির শর্তাবলী সম্পর্কে বিমান বোর্ডের পরিচালক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব আবদুর রউফ তালুকদার জানতে চাইলেও বিস্তারিত কিছু জানাননি মাহবুব।

বোর্ডের সদস্যদের অভিযোগ, বাংলাদেশ বিমানের লাভের কথা না ভেবেই নিজেদের ব্যক্তিগত সুবিধার জন্য একটি সিন্ডিকেট হেস্টন এয়ারলাইন্সকে ইজারা দেওয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। বিমান বোর্ডের চেয়ারম্যানের আত্মীয় মাহবুব নিজের সুবিধার জন্য এ প্রস্তাব দিয়েছিলেন বলেও দাবি তাদের।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুই বোর্ড সদস্য জানান, ২০১৮ ও ২০১৯ সালের মতোই নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ বিমান হজ ফ্লাইট পরিচালনা করতে সক্ষম। ইজারা নেওয়ার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তারা বোর্ডের পাশাপাশি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়কে তা পর্যালোচনার আহ্বান জানিয়েছেন।

বোর্ডের ওই দুই সদস্য আরও জানান, যেসব সংস্থা কম খরচে ফ্লাইট পরিচালনার প্রস্তাব দেয়, তারা সেসব সংস্থাগুলোকেই পছন্দ করেন এবং প্রাধান্য দেন। এছাড়া, গত হজ মৌসুমে বাংলাদেশ বিমান প্রায় ২০০ কোটি টাকা লাভের মুখ দেখেছে বলেও জানান ওই দুই বোর্ড সদস্য।

৯০ দিনের চুক্তি অনুযায়ী এবারের হজযাত্রায় ৭৫টি ফ্লাইট পরিচালনা করতে বাংলাদেশ বিমানের ব্যয় হবে ৬০ কোটি টাকা। সেই হিসেবে বাংলাদেশ বিমানের প্রায় ১৩০-১৪০ কোটি টাকা লোকসান হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট একটি সুত্র।

অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা যায়, গত হজ মৌসুমের আয়ের তুলনায় বাংলাদেশ বিমান প্রায় ২০০ কোটি টাকা লোকসান হবে।

তারা বলেন, “বহর ছোট এবং হজ যাত্রীদের সংখ্যা বেশি থাকার পরেও বাংলাদেশ বিমান তখন নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় হজ ফ্লাইটের ব্যবস্থা করতে সক্ষম হয়েছিল। তাহলে আধুনিক নৌবহর এবং উন্নত সুযোগসুবিধার পরেও এখন কেন তা সম্ভব হবে না?”

তারা আরও বলেন, “যেসব রুটে যাত্রী কম, সেসব বিমান হজ ফ্লাইটে ব্যবহার করা উচিত। বাংলাদেশ বিমান যদি সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জন করতে চায়, তাহলে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় হজ ফ্লাইট পরিচালনা করা উচিত।”

এদিকে, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মো. মাহবুব আলী জানান, তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন। বিমান কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তিনি এ বিষয়ে কথা বলবেন বলে জানান। বিমান নিজে থেকে হজ ফ্লাইট পরিচালনা করতে পারে কি-না জানতে চাইলে তিনি জানান, সেভাবে লাভের সুযোগ থাকলে ইজারা দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই।

উল্লেখ্য, আগামী ৩১ মে হজ ফ্লাইট শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশ বিমান এ বছর ৭৫টি ডেডিকেটেড ফ্লাইটে ৩১ হাজার হজযাত্রী বহন করবে। বাকিরা হজযাত্রীরা সৌদিয়ায় যাত্রা করবেন।

এমএসি/আরএইচ